Home / Health / পাকস্থলীর আলসার বা পেপটিক আলসারে করনীয়

পাকস্থলীর আলসার বা পেপটিক আলসারে করনীয়

আলসার হলো একধরনের ক্ষত বা ঘা যা পাকস্থলীর ভিতরের আবরণ, ক্ষুদ্রান্ত্রের উপরিভাগে অথবা খাদ্যনালির ভেতরে হয়ে থাকে। সাধারণত পাকস্থলী, ইসোফেগাস ও ক্ষুদ্রান্ত্রের গাত্রে এসিডের কারণে এই ক্ষত হয়। এটি অনেকেরই হয়।নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে রোগ নিরাময় করা সম্ভব। পাকস্থলীর আলসারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো পেট ব্যথা। আবার দীর্ঘদিন পেইনকিলার জাতীয় ওষুধ যেমন- অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ইত্যাদি সেবন করলে আলসার হতে পারে। সাধারনত এসব ওষুধের সঙ্গে আলসার প্রতিরোধী ওষুধ যেমন- রেনিটিডিন, ওমিপ্রাজল ইত্যাদি খেলে এ সমস্যা হয় না।

হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামক একটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনে অনেক ক্ষেত্রে আলসার হয়ে থাকে। এছাড়াও এই এই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনে পাকস্থলীতে প্রদাহ হতে পারে। মুলত পাকস্থলী ও ডিওডেনামে পরিপাক রসের অসামঞ্জস্যতার কারনে পেপটিক আলসার হয়ে থাকে।

আলসার নির্ণয়ে পরীক্ষা
বেরিয়াম এক্সরে হতো। যদি কেউ অ্যান্ডোস্কোপি করতে ভয় পায় তাহলে বেরিয়াম এক্সরে করতে পারি। সেটি দিয়েও নির্ণয় করা যাবে। যিনি অ্যান্ডোস্কোপি করবেন উনি তো সচক্ষে দেখছেন। এই আলসারটা কী গভীর না সাধারণ। আরেকটি হলো উনি যদি মনে করেন অনেক সময় ম্যালিগনেন্সি হতে পারে। ম্যালিগনেন্ট আলসারও হতে পারে। সেক্ষেত্রে বায়োপসি করার প্রয়োজনীয়তা আসবে। তখন উনি যদি চোখে দেখে বুঝেন এখানে ম্যালিগনেন্সির আশঙ্কা আছে, তখন বায়োপসি নিয়ে নিলেন। এটা বেরিয়াম এক্সরে করলে সম্ভব নয়। কাজেই রোগটি ভালোভাবে নির্ণয় করতে যে সুবিধা দরকার সেটি কেবল অ্যান্ডোস্কোপিতেই সম্ভব।

প্রাথমিকভাবে রোগীর ইতিহাস ও লক্ষণ দেখেই চিকিৎসকেরা আলসার সনাক্ত করতে পারেন। তারপরেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিছু পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে। আলসার নির্ণয়ের জন্য এন্ডোস্কোপি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষাটি তূলনামূলকভাবে কষ্টকর হওয়ায় অনেকেই এটি করতে ভয় পান। কেউ যদি এন্ডোস্কোপি করতে না চান, তাহলে বেরিয়াম এক্সরে করতে পারেন। এটি দিয়েও আলসার নির্ণয় করা যায় তবে অ্যান্ডোস্কোপি পরিক্ষায় সঠিকভাবে দেখা যায় আলসার কতটা গভীর। আবার অ্যান্ডোস্কোপি করলে বোঝা যায় এটা ম্যালিগনেন্ট আলসার কিনা। সেক্ষেত্রে বায়োপসি করার প্রয়োজন হতে পারে। তাই কষ্টকর হলেও রোগটি ভালোভাবে নির্ণয় করার জন্য এন্ডোস্কোপি পরীক্ষাই সেরা উপায়। আবার চিকিৎসকের ক্যান্সার হয়েছে সন্দেহ হলে জিআই টেস্ট ও এক্স-রে করারও প্রয়োজন হতে পারে।

আলসারের চিকিৎসা
প্রথমত পেপটিক আলসারে আক্রান্ত রোগীকে ধূমপান বন্ধ করতে হবে এবং পেইনকিলার জাতীয় ওষুধ সেবন করা যাবে না। খাবার গ্রহনে কোন অনিয়ম করা যাবে না।

আলসারের চিকিৎসা সাধারণত কারণের ওপর নির্ভর করে। হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনে আলসার হলে, বিভিন্ন ওষুধের সমন্বয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। যেমন- অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় এবং প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর গোত্রের অ্যান্টি আলসারেন্ট জাতীয় ওষুধ। এতে কিছুটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। যেমন- ডায়রিয়ার মতো পাতলা পায়খানা। সমস্যা বেশি হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

অপরদিকে হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি দিয়ে আলসার না হলে, সেক্ষেত্রে প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা হয়। আবার এসিড ব্লকার গোত্রের ওষুধও ব্যবহার করা হতে পারে। পেপটিক আলসারের রোগীদের চিকিৎসকেরা সাধারণত এন্টাসিড, রেনিটিডিন, ফেমোটিডিন, ওমিপ্রাজল, ইসোমিপ্রাজল, লেনসো প্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল জাতীয় ওষুধ দিয়ে থাকেন। আলসার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গভীর হয়, তাই নিয়মিতভাবে এবং পুরোমাত্রায় ওষুধ খেতে হবে।

পেপটিক আলসারের ক্ষেত্রে অপারেশনের সাধারণত প্রয়োজন হয় না। আবার দীর্ঘসময় ধরে ওষুধ সেবনের পরও সুস্থ্য না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অপারেশন করানোর প্রয়োজন হতে পারে। অপরদিকে ম্যালিগনেন্ট আলসারের ক্ষেত্রে সাধারনত ওষুধে কাজ হয় না। প্রাথমিক অবস্থায় ম্যালিগনেন্ট আলসার সনাক্ত হলে এবং বায়োপসি পরীক্ষায় নিশ্চিত হলে দেরি না করে দ্রুত অপারেশন করে সম্পূর্ণ সুস্থ্য হওয়া সম্ভব।

 

আলসার প্রতিরোধে করনীয়
আলসার প্রতিরোধে জীবনাচরণে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন-

নিয়মিত এবং সঠিক সময়ে খাবার খাওয়া।
সিগারেট বা যেকোনো মাদকদ্রব্য বর্জন করা।
নিয়মিতভাবে এবং সঠিক পরিমানে ওষুধ সেবন।
শাকসবজি, ফলমূল এবং আঁশযুক্ত খাবার গ্রহন।
অতিরিক্ত ঝাল, মসলাযুক্ত খাবার না খাওয়া।
অতিরিক্ত তেল বা চর্বি জাতীয় খাবার কম খাওয়া।
অ্যালকোহল, কোমল পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস বর্জন।
যেকোনো ওষুধ বিশেষ করে পেইনকিলার জাতীয় ওষুধ সেবনে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

প্রতিকারের উপায়
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন ও খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন এনে সহজেই এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। যেমন-

প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে হবে। এতে অতিরিক্ত এসিড নিষ্ক্রিয় হয়ে আলসারের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
ধূমপান, মদ্যপান, চা, কফি ইত্যাদি বর্জন করতে হবে।
ভাজাপোড়া ও মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া কমাতে হবে।
অতিরিক্ত লবন খাওয়া যাবে না। অতিরিক্ত লবন অনেক ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক হয়।
পেইনকিলার জাতীয় ওষুধ খাওয়া যাবে না।
ভিটামিন-এ, সি ও ই যুক্ত ফল-মূল ও শাক-সবজি বেশি পরিমানে খেতে হবে। কারন- এ সকল ভিটামিন আলসারের ঘা শুকাতে সাহায্য করে।
সামুদ্রিক মাছ বেশি করে খেতে হবে। কারন সামুদ্রিক মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে যা প্রোস্টাগ্লাণ্ডিন তৈরি করে আলসার শুকাতে সাহায্য করে।
সবশেষে
আলসার প্রতিরোধে জীবনব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। পরিচ্ছন্নভাবে থাকলে, সময়মত খাবার খেলে, খাবার গ্রহনের ক্ষেত্রে একটু সতর্ক হলে, ধূমপান কিংবা অন্য কোন মাদক বা অ্যালকোহল না খেলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ সেবন না করলে সহজেই এ রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়। আবার ব্যথার ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হলে তা ভরাপেটে খেতে হবে এবং সাথে অবশ্যই গ্যাসের ওষুধ খেতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আলসার ওষুধে ভাল হয়ে যায়। অপরদিকে চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে অবশ্যই দেরি না করে দ্রুত অপারেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ই-হাসপাতাল

About Admin

Check Also

হেপাটাইটিস এ কি? হেপাটাইটিস এ এর লক্ষন ও চিকিৎসা

হেপাটাইটিস এ হল হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাসের সংক্রমনে সৃষ্ট একটি তীব্রসংক্রামক রোগ যা প্রদাহ সৃষ্টি করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *